রাত পোহালেই ভোট উৎসব, নজিরবিহীন নিরাপত্তা
রাত পোহালেই বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। ভোট কেন্দ্র করে সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । বাড়ানো হয়েছে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাও।
সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন করতে নিরাপত্তার চাদরে মোড়া হয়েছে সিলেট বিভাগ। শহর থেকে গ্রাম কোথাও নিরাপত্তার ঘাটতি রাখেনি আিইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবুও ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে রয়ে গেছে শঙ্কা।
উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে। দিনভর প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের মধ্যে টাকা ছড়ানো ও ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করার পাল্টাপাল্টি অভিযোগও ছিল বেশ আলোচনায়।
তবুও সব শঙ্কা উড়িয়ে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। ভোটের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুলিশ, র্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অধিকাংশ কেন্দ্রে পৌঁছে গেছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারি এবং শক্ত অবস্থান নেওয়া হয়েছে। রাকা হয়েছে ড্রোন দিয়ে নজরদারি।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্র তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে—সাধারণ, গুরুত্বপূর্ণ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও মোবাইল টিম মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি বডি-ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন উড়বে এবার।
সিলেট বিভাগের ১৯ আসনে এবার ভোটযুদ্ধে লড়বেন ১০৫ প্রার্থী। এরই মধ্যে সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার সকাল থেকে সিলেটের ২ হাজার ৯৩৭টি কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়েছে নির্বাচনের সরঞ্জাম।
ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তায় বিভাগজুড়ে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ৩ জন পুলিশ ও ১৩ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি পুলিশের মোবাইল টিম, পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স, র্যাব, বিজিবির টহল টিম, সেনাবাহিনী, ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট বিভাগজুড়ে দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে পোস্টাল ব্যালটে ৪২ হাজার নিবন্ধন করা হলেও এরই মধ্যে ৩৬ হাজার পোস্টাল ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে সরঞ্জাম বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
এ সময় তিনি জানান, জেলার প্রায় চার শতাধিক কেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনজন পুলিশ সদস্য ও ১৩ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি আরও বলেন, সিলেটে প্রায় ৪২ হাজার ভোটার পোস্টাল ব্যালেটের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার পোস্টাল ব্যালেট এসে পৌঁছেছে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই উল্লেখ করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে। সীমান্তবর্তী ছয়টি উপজেলায় স্থায়ীভাবে সেনা মোতায়েন না থাকলেও প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর টহল টিম পাঠানো হবে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নগরের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মানুষ যেভাবে একটি সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে চায়, সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি।
এসএমপি কমিশনার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো ইতিমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত মহড়া ও সমন্বয় কার্যক্রম চলছে। তাঁর দাবি, প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এসএমপির আওতায় মোট ২৯৪টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট-১ আসনে ২১৫টি এবং বাকিগুলো সিলেট-৩ আসনের অংশ। প্রতিটি কেন্দ্রে ১২ জন করে আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে চারজন এবং সাধারণ কেন্দ্রগুলোতে তিনজন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
এ ছাড়া ৬৬টি মোবাইল টিম, ১২টি স্ট্রাইকিং টিম ও দুটি স্ট্যান্ডবাই টিম নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালন করবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি থাকবে বলে জানান তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির কথাও উল্লেখ করেন এসএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, প্রতিটি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে ‘জিনিয়া’ অ্যাপ রয়েছে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল রুমে তথ্য পৌঁছাবে এবং নিকটবর্তী মোবাইল টিম সক্রিয় হয়ে ঘটনাস্থলে যাবে। পাশাপাশি ছয়টি থানায় ১০টি ড্রোন সার্বক্ষণিকভাবে নজরদারিতে থাকবে।
রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে মোট ১০৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় সূত্র আরও জানায়, সিলেটের ১৯টি সংসদীয় আসনে শুরুতে মোট ১৭৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। এর মধ্যে ১৪৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন।
যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করা হয় ১১০ জনের মনোনয়নপত্র এবং বাতিল করা হয় ৩৬ জনের মনোনয়ন। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেন ২৮ জন প্রার্থী। আপিল শুনানি শেষে ২৩ জন প্রার্থী তাঁদের প্রার্থিতা ফিরে পান।
পরবর্তী সময়ে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন ২৮ জন। সব প্রক্রিয়া শেষে সিলেটের ১৯টি সংসদীয় আসনে চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৫ জনে।









