নারী-পুরুষের পর্দা নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে পর্দা শুধু নারীর জন্য নির্ধারিত কোনো বিধান নয়; নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই শালীনতা, দৃষ্টি সংযম ও সতর হেফাজতের নির্দেশ রয়েছে। তবে নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠন, সামাজিক ভূমিকা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্দার কিছু বিধানে পার্থক্য রয়েছে। তাই ‘পর্দা মানেই শুধু নারীর পোশাক’- ধারণা ইসলামের সামগ্রিক নির্দেশনার সাসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পর্দার ক্ষেত্রে পুরুষের প্রথম দায়িত্ব দৃষ্টি সংযত রাখা এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা প্রথমে মুমিন পুরুষদের উদ্দেশে বলেন, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে। এরপর একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মুমিন নারীদের।
সুরা আন-নুরের ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, মুমিন পুরুষ ও নারীরা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এ নির্দেশ থেকে স্পষ্ট হয়, পর্দার দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের।পুরুষের পর্দা বলতে শুধু পোশাক বোঝায় না। পরনারীর দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে না তাকানো, অশালীনতা থেকে নিজেকে দূরে রাখা, কথাবার্তা ও আচরণে সংযম বজায় রাখা এবং গায়রে মাহরাম নারীর সাথে শরিয়তসম্মত সীমারেখা মেনে চলাও এর অন্তর্ভুক্ত।
পুরুষের পর্দা বলতে শুধু পোশাক বোঝায় না। পরনারীর দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে না তাকানো, অশালীনতা থেকে নিজেকে দূরে রাখা, কথাবার্তা ও আচরণে সংযম বজায় রাখা এবং গায়রে মাহরাম নারীর সাথে শরিয়তসম্মত সীমারেখা মেনে চলাও এর অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে নারীর জন্য শালীন ও শরিয়তসম্মত পোশাক পরিধান, সৌন্দর্য প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা এবং গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে শরীর যথাযথভাবে আবৃত রাখা পর্দার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাইরে চলাফেরার ক্ষেত্রে পোশাক ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখার বিষয়েও ইসলামে নির্দেশনা রয়েছে।
দৃষ্টি সংযমের ওপর ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চোখের ব্যভিচার হলো হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে তাকানো। মানুষের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও পাপের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে এবং অন্তরের আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষকে বড় গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ কারণে দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা পর্দার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইসলামে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে নির্জনে নারী-পুরুষের একসাথে অবস্থান করা থেকে সতর্ক করেছেন নবীজি (সা.)। তিরমিজির বর্ণনায় এসেছে, কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে থাকলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।
এ ছাড়া কোরআনে পর্দা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার গুরুত্ব বোঝাতে সুরা আল-আহজাবের ৫৩ নম্বর আয়াতে পর্দার আড়াল থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস চাওয়ার নির্দেশের কথা বলা হয়েছে। আয়াতটিতে অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
পর্দার সাথে সতর ঢেকে রাখার বিষয়টিও জড়িত। ইসলামী বিধান অনুযায়ী নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই শরীরের নির্দিষ্ট অংশ আবৃত রাখা আবশ্যক। তবে নারী ও পুরুষের সতরের সীমা এক নয়। এ কারণে উভয়ের পোশাকের বিধানেও কিছু পার্থক্য রয়েছে।
পর্দা শুধু পোশাকের বিষয় নয়; এটি মানুষের দৃষ্টি, আচরণ, কথা ও চলাফেরার সাথেও সম্পর্কিত। একজন পুরুষ যেমন নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন, তেমনি একজন নারীও নিজের সৌন্দর্য ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখবেন। একই সাথে উভয়েরই অশ্লীলতা ও অনৈতিক সম্পর্ক থেকে নিজেদের রক্ষা করা দায়িত্ব।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষের গোপন বিষয় সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন। সুরা গাফিরের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তিনি চোখের গোপন দৃষ্টি এবং মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা বিষয় সম্পর্কে অবগত।
তাই ইসলামের পর্দার বিধানকে শুধু নারীর পোশাকের সাথে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই এর মূল শিক্ষা হলো দৃষ্টি সংযত রাখা, সতর ঢেকে রাখা, শালীনতা বজায় রাখা এবং গায়রে মাহরামের সাথে নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলা।
তবে নারী-পুরুষের পর্দার সব বিধান হুবহু এক নয়। পোশাক ও সতরের ক্ষেত্রে যেমন কিছু পার্থক্য রয়েছে, তেমনি সামাজিক পরিস্থিতি ও দায়িত্বের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের ভিন্নতা আছে। মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তি ও সমাজকে অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও পাপাচার থেকে রক্ষা করা এবং মানুষের মর্যাদা ও পবিত্রতা বজায় রাখা।
সুতরাং পর্দা শুধু নারীর দায়িত্ব—এমন ধারণা সঠিক নয়। ইসলামে নারী ও পুরুষ উভয়কেই নিজেদের দৃষ্টি, পোশাক, আচরণ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা মেনে চলতে বলা হয়েছে। এভাবেই পর্দার ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়।









